• ঢাকা, বাংলাদেশ
  • শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬, ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

সংসদ সদস্যের সুপারিশ উপেক্ষিত: কেবিএস প্রকল্প অসম্পূর্ণ

সংসদ সদস্যের সুপারিশ উপেক্ষিত: কেবিএস প্রকল্প অসম্পূর্ণ

জেলা প্রতিনিধি

কেবিএস প্রকল্পের অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করতে এবং প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করতে স্থানীয় সংসদ সদস্যরা প্রধান প্রকৌশলীর কাছে আধা-সরকারি (ডিও) পত্র পাঠালেও তা কোনো পাত্তা দিচ্ছেন না প্রকল্প পরিচালক (পিডি) মো. কামরুজ্জামান। সংসদ সদস্যদের সুপারিশ ও মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্রকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে আগামী ৩০ জুনের মধ্যে তড়িঘড়ি করে প্রকল্প সমাপ্ত করার তোড়জোড় চলছে। ফলে সরকারের বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ যেমন ঝুঁকিতে পড়ছে, তেমনি টেকসই উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন তিন জেলার লাখ লাখ মানুষ। উল্লেক্ষ্য, খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলার সড়ক ও অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য গৃহীত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘কেবিএস’ (খুলনা-বাগেরহাট-সাতক্ষীরা) প্রকল্প।

সংসদ সদস্যদের ডিও লেটার উপেক্ষা

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলমান কাজগুলো সম্পন্ন করার স্বার্থে প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধির দাবি জানিয়ে জোর সুপারিশ করেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্যরা। সাতক্ষীরা-১ (তালা-কলারোয়া) আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ ইজ্জত উল্ল্যাহ প্রধান প্রকৌশলীর কাছে পাঠানো এক আধা-সরকারি (ডিও) পত্রে চলমান স্কিমগুলো সফলভাবে সম্পন্ন করতে কেবিএস প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করার জোর আহ্বান জানিয়েছেন।

অনুরূপ উদ্বেগ প্রকাশ করে খুলনা-৪ আসনের সংসদ সদস্যও একটি ডিও পত্র দিয়েছেন। তাঁদের স্পষ্ট বক্তব্য, অসম্পূর্ণ কাজ রেখেই যদি প্রকল্পের সমাপ্তি টানা হয়, তবে সাধারণ জনগণ সরকারের এই মেগা উদ্যোগের কোনো সুফল পাবে না। উল্টো সরকারের এত বড় উন্নয়ন কার্যক্রম জনমনে প্রশ্নের মুখে পড়বে।

সংসদ সদস্যদের পাঠানো এসব গুরুত্বপূর্ণ পত্রের পর প্রধান প্রকৌশলী নিজে উদ্যোগী হয়ে সেগুলো পরিকল্পনা কমিশন ও প্রকল্প পরিচালকের কার্যালয়ে পাঠান এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানান। তবে সংশ্লিষ্ট মহলে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে কারণ, প্রকল্প পরিচালক (পিডি) এই জনগুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ ও উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনাকে বিন্দুমাত্র গুরুত্ব দিচ্ছেন না।

মাঠের বাস্তবতা বনাম পিডির 'লুকোচুরি' তথ্য
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন এবং অবকাঠামোগত সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে ২০১৬ সালে কেবিএস প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। নির্ধারিত মেয়াদে কাজ শেষ না হওয়ায় পরবর্তীতে এক দফা মেয়াদ বাড়ানো হয়েছিল। সেই বর্ধিত মেয়াদও শেষ হচ্ছে আগামী ৩০ জুন।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশন ও পিএসসি (প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি) সভায় প্রকল্প পরিচালক মাত্র ১৬টি চলমান স্কিমের তথ্য উপস্থাপন করেছেন। সভায় তিনি দাবি করেছেন, আগামী জুনের মধ্যেই এই ১৬টি স্কিমের কাজ শতভাগ শেষ করা সম্ভব।

অথচ মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলার নির্বাহী প্রকৌশলীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই তিন জেলায় বর্তমানে প্রায় শতাধিক স্কিমের কাজ এখনও চলমান ও অসম্পূর্ণ রয়েছে।

খুলনা জেলা: জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী পিডির কাছে লিখিত চিঠি পাঠিয়ে স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, তাঁর জেলার অন্তত ১৩টি সাব-প্রকল্প কোনোভাবেই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করা সম্ভব নয়।

সাতক্ষীরা জেলা: এই জেলা থেকে প্রায় অর্ধশতাধিক (৫০টির বেশি) চলমান স্কিমের ধীরগতির অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে।

বাগেরহাট জেলা: বাগেরহাট থেকেও একই ধরনের অসম্পূর্ণ কাজের বিবরণী ও শঙ্কার প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে।

মাঠপর্যায়ের এই বাস্তব ও নিখুঁত তথ্যকে সম্পূর্ণ ধামাচাপা দিয়ে পিডি পরিকল্পনা কমিশনে সীমিত ও মনগড়া তথ্য উপস্থাপন করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এর মূল উদ্দেশ্য প্রকল্পের প্রকৃত ব্যর্থতার চিত্র আড়াল করা।

একনায়কতন্ত্র ও সমন্বয়হীনতার অভিযোগ
নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রকল্পের একাধিক পদস্থ কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "প্রকল্প পরিচালক মাঠের কর্মকর্তাদের কিংবা জনপ্রতিনিধিদের মতামতকে কোনো পাত্তাই দেন না। তিনি শুরু থেকেই একতরফা ও একক সিদ্ধান্তে প্রকল্প চালাচ্ছেন।"

এক কর্মকর্তা জানান, মাঠের বাস্তবতা আর পিডির টেবিলের তথ্যের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত। এই সমন্বয়হীনতার কারণে অনেক স্কিমের কাজের গতি স্থবির হয়ে পড়েছে। শুরু থেকেই পিডি মেয়াদ না বাড়ানোর পক্ষে একগুঁয়ে অবস্থান নেওয়ায় বর্তমানে ঠিকাদার ও মাঠপর্যায়ের প্রকৌশলীরা চরম মানসিক ও প্রশাসনিক চাপের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

নিজস্ব জেলায় টাকা স্থানান্তর ও অর্থসংকট
প্রকল্পের অর্থায়ন নিয়েও উঠেছে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ। সংশ্লিষ্টদের দাবি, আগামী অর্থবছরের জন্য এই প্রকল্পে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। কিন্তু প্রকল্প পরিচালক ক্ষমতার অপব্যবহার করে সেই বরাদ্দের মধ্য থেকে ২০ কোটি টাকা তাঁর নিজের জেলা কুষ্টিয়ার একটি প্রকল্পে স্থানান্তর করেছেন। এর ফলে খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার চলমান স্কিমগুলোর বাস্তবায়নে অর্থসংকট আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে।

ঠিকাদারদের আতঙ্ক ও মাঠের করুণ দশা
সরেজমিনে তিন জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অসংখ্য সড়ক, সেতু ও কালভার্টের নির্মাণকাজ মাঝপথে ঝুলে আছে। কোথাও সড়ক খুঁড়ে মাসের পর মাস ফেলে রাখা হয়েছে, কোথাও সেতুর পিলার বা স্প্যান অর্ধেক তৈরি করে রাখা হয়েছে, আবার কোথাও নির্মাণসামগ্রী স্তূপ করে রেখে কাজ পুরোপুরি বন্ধ।

স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, আর কিছুদিন পরই বর্ষা মৌসুম শুরু হবে। বর্ষার আগে এই খোঁড়াখুঁড়ি ও অসম্পূর্ণ সেতু-কালভার্ট ঠিক না হলে তিন জেলার যোগাযোগব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়বে এবং মানুষের ভোগান্তি চরমে উঠবে।

চলমান কাজের একাধিক ঠিকাদার জানান, তাঁরা বর্তমানে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে আছেন। এক ঠিকাদার বলেন, "সময়ের তুলনায় কাজের পরিধি অনেক বেশি বাকি। কাজ শেষ না হলে আমাদের বিল আটকে যাবে। অনুমোদন ও প্রশাসনিক জটিলতার আতঙ্কে আমরা পিডির কার্যালয়ে যেতেই ভয় পাচ্ছি, সেখানে গেলেই উল্টো চাপ দেওয়া হয়।" আরেকজন বলেন, "যন্ত্রপাতি বাড়িয়ে দিনরাত কাজ করেও এত কম সময়ে গুণগত মান বজায় রেখে কাজ শেষ করা অসম্ভব।"

কর্মকর্তাদের বক্তব্য ও পিডির দায়সারা আচরণ
সাতক্ষীরার নির্বাহী প্রকৌশলী তারিকুল হাসান এবং খুলনার নির্বাহী প্রকৌশলী উভয়েই বাস্তব পরিস্থিতি স্বীকার করে বলেছেন, আগামী ৩০ জুনের মধ্যে কাজ শেষ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। বাস্তবতা বিবেচনা করে যদি প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো না হয়, তবে এই বিপুল উন্নয়ন অসম্পূর্ণ ও পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকবে।

এসব অনিয়ম, তথ্য গোপন, টাকা স্থানান্তর এবং সংসদ সদস্যদের ডিও লেটার অবমূল্যায়নের বিষয়ে সরাসরি জানতে চাওয়া হয়েছিল প্রকল্প পরিচালক মো. কামরুজ্জামানের কাছে। তিনি ক্ষুব্ধ কণ্ঠে কেবল বলেন, "আমি এখানে থাকতে চাই না। প্রকল্পের মেয়াদ আর বাড়ানো হবে না।" এরপর প্রকল্পের বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে আরও প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো সদুত্তর না দিয়ে ফোন কেটে দেন।

২১ মে ২০২৬, ০২:০৮এএম, ঢাকা-বাংলাদেশ।