মৌলভীবাজার থেকে এডিনবরা: ড. ওয়ালি তাসার উদ্দিনের সাফল্যের গল্প
ড. ওয়ালি তাসার উদ্দিন
ড. ওয়ালি তাসার উদ্দিনের এডিনবরায় প্রতিষ্ঠিত রেস্টুরেন্টগুলো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। তিনি ব্যবসায়িক সফলতার পাশাপাশি দাতব্য, মানবসেবা ও শিক্ষাক্ষেত্রে অবদান রেখেছেন। স্কটল্যান্ডে বাংলাদেশের কমিউনিটি ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্বদান, আন্তর্জাতিক খেতাব ও সম্মাননা প্রাপ্তি তাকে সমাজসেবক ও প্রভাবশালী নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
জন্ম ও শৈশব
ড. ওয়ালি তাসার উদ্দিন ১৯৫২ সালের ১৭ এপ্রিল বাংলাদেশের মৌলভীবাজার জেলায় এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। মৌলভীবাজারে তিনি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। ১৯৬৭ সালে তিনি মাত্র ১৫ বছর বয়সে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান। নতুন দেশে গিয়ে প্রথমদিকে রেস্টুরেন্টে কাজ শুরু করেন এবং সেইসঙ্গে তার শিক্ষা চালিয়ে যেতে থাকেন।
প্রবাস জীবন ও কর্মজীবনের সূচনা
লন্ডনে কাজ ও পড়াশোনার মাধ্যমে কেটারিং শিল্পে তিনি অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। ১৯৭৬ সালে তিনি এডিনবরা শহরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। এখান থেকেই শুরু হয় তার ব্যবসায়িক যাত্রা।
ব্যবসা ও বাণিজ্যে অবদান
রেস্টুরেন্ট শিল্পে তার অবদান অসাধারণ। তিনি যুক্তরাজ্যে একাধিক খ্যাতনামা রেস্টুরেন্ট প্রতিষ্ঠা করেন
- Verandah Restaurant
- Lancers Restaurant
- Britannia Spice Restaurant
Britannia Spice একাধিক আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জন করেছে, যেমন—
- Les Routiers Best Newcomer Award (২০০১)
- British Curry Awards – Best in Scotland (২০০৫, ২০০৬, ২০০৭)
- BIBA Award (২০০৪, ২০০৫, ২০০৬, ২০০৭, ২০১৪)
- Sunday Times Travel Magazine: Best Indian Restaurant in Scotland (২০০১)
- Irn Bru Curry Awards – Restaurant of the Year (২০০৮)
- Bangladesh Caterers Association Restaurant of the Year (২০১৪)
- Good Curry Guide Exceptional Restaurant of the Year (২০১৪)
রেস্টুরেন্ট খাতে তার নেতৃত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি BIBA Industry Personality of the Year (২০০৬) এবং Asian Jewel Lifetime Achievement Award লাভ করেন।
শুধু ব্যবসায় নয়, তিনি যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্ক মজবুত করার ক্ষেত্রেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি Bangladesh-British Chamber of Commerce-এর প্রেসিডেন্ট ও মহাপরিচালক ছিলেন। তার নেতৃত্বে ২০০৫ সালে যুক্তরাজ্যে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের জন্য বিশেষ বাণিজ্য প্রদর্শনী Expo Bangladesh অনুষ্ঠিত হয়। এতে বাংলাদেশের শতাধিক প্রতিষ্ঠান এবং যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রবাসী ব্যবসায়ীরা অংশ নেন। বর্তমানে তার নেতৃত্বে EBFCI ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কার্যক্রম সম্প্রসারণ করছে।
মানবসেবা ও সমাজকল্যাণমূলক কাজ
ড. উদ্দিন শুধু একজন সফল উদ্যোক্তাই নন, তিনি একজন দাতব্যকর্মী ও মানবসেবক। তার কিছু উল্লেখযোগ্য দাতব্য উদ্যোগ হলো—
- ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য তিনি প্রায় £১৪০,০০০ সংগ্রহ করেন, যা দিয়ে একটি সাইক্লোন শেল্টার ও বাহারচরা-রতনপুর উচ্চ বিদ্যালয় নির্মিত হয়।
- ১৯৯৮ সালে তিনি £২২০,০০০ তহবিল সংগ্রহে সহযোগিতা করেন, যা দিয়ে “অন্বেষণ” একটি মডেল গ্রাম ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণ করে।
- তিনি সিলেট উইমেনস মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল-এর চেয়ারম্যান ও প্রধান সমন্বয়ক।
- বাংলাদেশ ফিমেল একাডেমি-র ট্রাস্টি।
- আতীশ দীপঙ্কর ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, ঢাকা-র উপদেষ্টা।
- বাংলাদেশ ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের বোর্ড সদস্য।
- তিনি BRAC UK-এর সিনিয়র উপদেষ্টা।
- British-Bangladeshis Royal Honored Council (BBRHC)-এর যৌথ আহ্বায়ক।
- Scottish Parliament International Development Committee-র উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
- NRB World-এর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অবদান
- ১৯৮৪ সালে তিনি স্কটল্যান্ডের প্রথম বাংলাদেশি Justice of the Peace নিযুক্ত হন।
- ১৯৯৩ সালে তিনি স্কটল্যান্ডে বাংলাদেশের প্রথম Honorary Consul-General হন।
- ১৯৯৫ সালে জাতিগত সম্প্রীতিতে অবদানের জন্য তিনি MBE (Member of the British Empire) খেতাব পান।
- ২০০০ সালে Queen Margaret University, Edinburgh তাকে Doctor of Business Administration (Honoris Causa) প্রদান করে।
- ২০০৭ সালে Heriot-Watt University তাকে Doctor of Letters (D. Litt.) এবং Edinburgh Napier University তাকে Doctor of the University উপাধি প্রদান করে।
- তিনি Royal Society of Arts (FRSA)-এর ফেলো।
- ২০০৩ সালে তিনি Debrett’s People of Today-এ অন্তর্ভুক্ত হন।
- ১৯৯২ সালে তিনি Junior Chamber Young Scot of the Year নির্বাচিত হন।
- ২০২৩ সালে তিনি King’s Awards for Enterprise-এর বিচারক ছিলেন।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব
ড. উদ্দিন দীর্ঘদিন ধরে স্কটল্যান্ডে বাংলাদেশি কমিউনিটির নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন।
- তিনি Council for Bangladeshis in Scotland-এর চেয়ারম্যান।
- এডিনবরার Central Mosque-এর প্রতিষ্ঠাতা।
- Shahjalal Mosque & Islamic Centre-এর ট্রাস্টি।
- Edinburgh Bangladesh Samity এবং Edinburgh Mela-র চেয়ারম্যান।
- BanglaScot Foundation-এর প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান।
- Commonwealth Society of Edinburgh-এর চেয়ারম্যান।
এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে তিনি শুধু বাংলাদেশি কমিউনিটিকে ঐক্যবদ্ধ করেননি, বরং দক্ষিণ এশীয় সংস্কৃতিকে স্কটল্যান্ডে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
ড. ওয়ালি তাসার উদ্দিন MBE DBA FRSA DLitt JP শুধুমাত্র একজন সফল ব্যবসায়ী নন, তিনি একজন সমাজসেবক, মানবতাবাদী, সাংস্কৃতিক দূত এবং বাংলাদেশি প্রবাসী সমাজের এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তিনি বিশ্বাস করেন, নতুন প্রজন্মের হাত ধরেই বাংলাদেশ আরও সমৃদ্ধ ও উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হবে।